আজ থেকে প্রায় ১১৯ বছর আগে লিখিত বেগম রোকেয়ার ধ্রুপদি উপন্যাস ‘সুলতানার স্বপ্ন” এ বছর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো কর্তৃক “মেমোরি অব দি ওয়ার্ল্ড” তালিকায় স্থান পেয়েছে যা নারীমুক্তি আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের প্রাণান্তকর চেষ্টায় মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলান বাটোরে ইউনেসকোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড কমিটি ফর এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’ বা মৌক্যাপের দশম সাধারণ সভায় ঘোষণাটি দেওয়া হয়। এই স্বীকৃতিই প্রমাণ করে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ উপন্যাসটি ছিল একটি যুগোত্তীর্ণ ভাবনা। বাংলাদেশে আমরা যারা নারী আন্দোলন ও নারীমুক্তি নিয়ে ভাবছি, তাদের জন্য “সুলতানার স্বপ্ন” উপন্যাসটি বিজ্ঞানমনস্ক মনন ও উন্নত সমাজ গড়ে তোলার জন্য একটি অত্যাবশক পাঠ্য বিষয় হতে পারে।
বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ উপন্যাসটি ১৯০৫ সালে মাদ্রাজের দ্য ইন্ডিয়ান লেডিজ ম্যাগাজিনে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। দিল্লির প্রাইম মিনিস্টার মিউজিয়াম অ্যান্ড লাইব্রেরিতে সেটি সংরক্ষিত আছে। নারীদের মুক্তিপ্রত্যাশী এই উপন্যাসটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর আদলে লেখা হয়েছিল যা ১৯০৮ সালে কলকাতার এস কে লাহিড়ী অ্যান্ড সন্স থেকে পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়। ১৯২২ সালে মতিচূর ২য় খণ্ডে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নামে এ উপন্যাসিটি যুক্ত করা হয়।
‘সুলতানার স্বপ্ন’ উপন্যাসটি অবলম্বনে ১৯৮০ সালে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নামে একটি নাটক মঞ্চায়িত হয়। এছাড়াও স্পানিশ চলচ্চিত্রকার ইসাবেল হারগুয়েরা একটি অ্যানিমেশন সিনেমা বানিয়েছেন। ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছেন তার জীবনসঙ্গী জিয়ানমার্কো সেরা। সিনেমাটির নাম দিয়েছেন, ‘এল সুয়েনিও দে লা সুলতানা’। এ বছর নভেম্বর মাসে চলচিত্রটি মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল।
আজ থেকে শতবর্ষ আগে বেগম রোকেয়া ‘লেডি ল্যান্ড’ বা নারীস্থানের চিত্র আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন। তীক্ষèাধিসম্পন্ন বেগম রোকেয়া সুলতানার স্বপ্নে একটি আদর্শ নারীস্থান কেমন হবে তার সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন ভগিনী সারার সাথে কথোপকথনের মাধ্যেমে । আজ আমরা যারা আদর্শ শহরের কথা ভাবছি, বা নারীর জন্য নিরাপদ কর্মস্থল, বা আবাসের কথা ভাবছি বা স্বল্প পরিশ্রমে আধুনিক জীবন-যাপনের কথা ভাবছি, বেগম রোকেয়া ‘সুলতানার স্বপ্ন’ উপন্যাটিতে সেই বিষয়গুলো সুনিপুণতায় উল্লেখ করেছেন।
তিনি আমাদের সামনে একটি কাল্পনিক নগরের সৌন্দর্যের বর্নণা করেছেন। নারীর নিরাপত্তাহীনতার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। সামাজিক বিধি-ব্যবস্থা কিভাবে নারীর বিকাশের পথে বাধা তার বর্নণা করেছেন। তিনি বলেছেন, “কেবল শারীরিক বল বেশী হইলেই কেহ প্রভুত্ব করিবে, ইহা আমরা স্বীকার করি না।” এর মাধ্যমে সেদিন সদম্ভে রোকেয়া পুরুষের প্রভুত্বকে অস্বীকার করেছেন। কিন্তু আজও কি আমরা মুক্ত হয়েছি পুরুষের প্রভুত্ব থেকে ? হয়নি। বরং প্রভুত্ব আরো বেড়েছে।
এছাড়াও তিনি এ কল্পকাহিনীতে শহরের বাড়ি কেমন হবে তার উল্লেখ করেছেন, যার রূপরেখা আধুনিক ডিজাইনরা এখন পর্যন্ত দিতে পারেনি। একটি বাড়িতে বাগান থাকবে, হাঁটার রাস্তা থাকবে, আধুনিক রান্না ঘর থাকবে এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকবে ইত্যাদি।
এই উপন্যাসে তিনি কর্মঘন্টার উল্লেখ করেছেন। দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের শ্রমঘন্টার উল্লেখ করেছেন। একজন নারী দক্ষ হলে ২ ঘন্টায় যে কাজ করতে পারে সেই কাজ পুরুষ করতে গেলে কিভাবে ৮ ঘন্টা সময় ব্যয় হয় তার বর্নণা তিনি নিখুঁতভাবে দিয়েছেন।
দারিদ্র কিভাবে সমাজকে জরাজীর্ণ করে, ধনী-গরীবের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে, বৈষম্যের সমাজে কেমন করে রোগের বিস্তার ঘটে এবং মানুষের মৃত্যু ঘটে তার উল্লেখ করেছেন। কিন্তু স্বচ্ছল বা বৈষম্যমুক্ত নারীস্থান কিভাবে রোগ-ব্যধি থেকে মানুষেকে মুক্ত করতে পারে তারও উল্লেখ করেছেন তিনি এই উপন্যাসে বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে।
এ উপন্যাসে তিনি সৌর-বিদ্যুৎ/সৌরকরের কথা বলেছেন। ১১৯ বছর আগে তিনি সৌরকর নিয়ে ভেবেছেন। অথচ আধুনিক বিশ্বে হাজারো গবেষণা করে এই সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার আমরা বাড়াতে পারছিনা। অথচ নারীস্থানে কিভাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে সহজে রান্না করা যায়, বিজ্ঞান চর্চা করা যায়, যুদ্ধ জয়ে ব্যবহার করা যায় তারও সাবলীল বর্নণা আছে।
এই উপন্যাসে তিনি নারীশিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন, মেয়েদের বিয়ের বয়স ২১ বছর নির্ধারণ করেছিলেন। অথচ একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা বিয়ের বয়স কমিয়ে মেয়েদের জন্য ১৬ বছর করার কথা ভাবলাম, ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! পৃথিবী এগিয়ে যায়, আর আমরা পিছিয়ে যাই। রক্ষণশীল একটি সমাজে সকল বাধা উপেক্ষা করে বেগম রোকেয়া যে নারীস্থান চিত্রায়িত করেছিলেন সত্যিকার অর্থে নারীমুক্তির আন্দোলনে আজও তা অবিস্মরণীয়।
ঝড়-বৃষ্টি নিবারণ, এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করার পদ্ধতিও নারীস্থানের নারীরা আয়ত্ত্ব করেছিলেন। সৌরশক্তি ব্যবহার করে মস্তিষ্ক বলে পুরুষদের পরাজিত করে যুদ্ধে জয়লাভও করেছিলেন নারীস্থানের নারীরা। নারীদের বিকাশের জন্য জ্ঞান যে গুরুত্বপূর্ণ তা আমরা এই কল্পকাহিনীর রোকেয়া তা গুরত্বের সাথে তুলে ধরেছেন।
একথায়, নারীস্থান ছিল জুলুম মুক্ত, সুখী-সমৃদ্ধ-জ্ঞানদীপ্ত একটি স্থান। তিনি বলেছেন, “আমার বন্ধু-বান্ধবীরা ভারী আচর্য্য হইবেন, যখন আমি দেশে গিয়া নারীস্থানের কথা বলিব, নন্দনকাননতুল্য নারীস্থানে নারীরা পূর্ণ আধিপত্য, যৎকালে পুরুষেরা মর্দ্দনায় থাকিয়া রন্ধন করেন, শিশুদের খেলা দেন, একথায় যাবতীয় গৃহকার্য করেন! আর রন্ধন প্রণালী এমন সহজ ও চমৎকার যে রন্ধনটা অত্যন্ত আমোদজনক ব্যাপার! ভারতে যেসকল বেগম খানম প্রমুখ বড় ঘরের গৃহীনিরা রন্ধনশালার ত্রিসীমায় যাইতে চাহেন না, তাহারা এমন কেন্দ্রীভূত সৌরকর পাইলে আর রন্ধনকার্যে আপত্তি করিতেন না।”
ভুমি কর্ষণ পদ্ধতি, বর্জপাত, গৃহবিবাদ, কাজের মর্যাদা, স্নানাগার প্রভৃতি বিষয় নিয়ে বেগম রোকেয়া এই কল্পকাহিনীতে আলোচনা করেছেন। ধর্ম- প্রেম-সত্য নিয়ে কথা বলেছেন। দণ্ড নিয়ে আলোচনা করেছেন। বায়ুজানের বর্নণা দিয়েছেন। শাসকের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও বলেছেন। মহারাণীর শাসন কাজের বর্নণার মাধ্যমে তা ফুটিয়ে তুলেছেন।
এক কথায়, একটি পূর্ণাঙ্গ নারীস্থান বা একটি সুন্দর নগর বা একটা দেশ কেমন হতে পারে তার কাল্পনিক রূপকল্প রচনা করেছেন বেগম রোকেয়া তাঁর ‘সুলতানার স্বপ্ন’ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে। প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা করে মানব সভ্যতা বিকাশে এ এক অসাধারণ চিত্রকল্প। আজ থেকে শতবর্ষ আগে রোকেয়া প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা করে যে নারীস্থান বা লেডিল্যান্ড চিত্রায়িত করেছেন, শতবর্ষ পরেও আমরা কি সেই আধুনিক শহর গড়ে তুলতে পেরেছি যেখানে নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে সকল মানবজাতি ও প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা পাবে?